লেখকঃ সিজানুর রহমান
মোতাহার ভবনের সামনে দাড়িয়ে আছি বেশ কিছুক্ষন। আমার পাশে রাসেল। ও বেশ বিরক্ত, বার বার ঘড়ি দেখছে। শেষ পর্যন্ন ও বিরক্ত হয়ে বলেই বসল, “কিরে আর কতক্ষন অপেক্ষা করবি? দশটা বাজে।” আমি কোন কথা না বলে আগের মতই দাড়িয়ে থাকলাম। রাসেল আবার বলল, “দোস্ত সকালে নাস্তা হয়নি! আমি যাই?” বললাম, “তোকে
অপেক্ষা করতে কে বলেছে, তুই যা।” “যাব? বলছিস? রাগ করবি নাতো!?” “রাগ করব কেন! তুই যা।” রাসেল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মোনোভাব বুঝার চেষ্টা করল; তারপর ব্যার্থ হয়ে উঠে চলে গেল। রাসেল চলে যাবার কিছুক্ষন পর সাদা পোশাকের একজন পুলিশ এল, “আপনার কোন অসুবিধা?” আমি মৃদু হেসে বললাম, “না। একজনের জন্য অপেক্ষা করছি।” “অনেক্ষন ধরেই অপেক্ষা করছেন দেখছি; কে হন উনি?” এই প্রশ্নের উত্তরটা আমার নিজেরই অজানা, তাই কিছুটা চিন্তা করে বললাম,“পরিচিত।” লোকটা আমার দিকে ভ্র“’কুচকে তাকালো, তারপর চলে গেল। এই নিয়ে চারবার পুলিশ এল। একবার আমার দেহ তল্লাসিও করে গেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমার হাতে একটা গোলাপ ছাড়া কিছুই নেই। এমনকি মানিব্যাগটাও নিয়ে বের হয়নি। হাতের ফুলটার একটা কাহিনী আছে। কাল রাত বারোটার দিকে হলের বাগান থেকে তুলে এনেছি। দারোয়ান মামা আর একটুর জন্য দেখতে পায়নি; ফুল তুলতে গিয়ে হাতের একটু জায়গা ছড়ে গেছে। ওসুধ দেয়ো দরকার ছিল, এখন জায়গাটা জ্বালা করছে।
গোলাপের দাম খুব একটা বেশি না, অন্য সময় শাহ্বাগ মোড়ে পাঁচ টাকাতেও গোলাপ পাওয়া যায়। আজকের ব্যপারটা অবশ্য ভিন্ন, এক একটা গোলাপ পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টাকাটা বড় কথা না, কাঞ্চি বা অষ্ট-ব্যাঞ্জনে বসে কখনও আমি টাকার কথা ভাবিনি। বাবার কাছ থেকে যা সবচেয়ে বেশি পেয়েছি, তা হচ্ছে টাকা। মা মারা যাবার পর থেকে বাবার সাথে আমার দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। হয়ত মাকে ভুলে থাকতেই বাবা কাজ নিয়ে এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে; কখনও তিনি খেয়ালই করেননি, আমি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছি। আমার বন্ধুর সংখ্যা নেহায়েত কম, তবু যারা আছে তাদের সাথে সময় বেশ কেটে যায়।
আজকের দিনটা বেশ আলাদা। কালো লুজ প্যান্ট আর সাদা পাঞ্জাবিটা আমার টাকা দিয়ে কেনা। আজকের দিনেই পরব বলে এদুটো কিনেছি, এর জন্য গত দুইমাস টিউশানি করেছি। বন্ধুদের মাঝে সাগর বেশ টিউশানি করায়। তাই ওকে একদিন ধরলাম,“দোস্ত আমি টিউশানি করব, আমাকে স্টুডেন্ট দিতে পারবি?” আমার কথা শুনে ঐ দিন সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল,“তুই টিউশানি করবি!!!?” আমি শান্ত কন্ঠে বলেছিলাম, “হ্যাঁ।” ঐ দিন ব্যপারটা সবাই মজা হিসাবে নিয়েছিল, ভেবেছিল আমি বোধহয় মজা করছি, কিংবা বেশি দিন আমি কন্টিনিউ করবো না। তাই সাগর তার নিজের টিউশানিটা আমাকে দিয়ে দেয়। যখন আমি টিউশানিটা কন্টিনিউ করতে লাগলাম, তখন একদিন সাগর চোখ-মুখ শুকিয়ে দিয়ে বলল,“তুই সত্যি সত্যি টিউশানি করবি!” আমি ওর ব্যপারটা জানি, বাসা থেকে খুব বেশি টাকা আসেনা। টিউশানিটাই ওর ভরসা, তাই বললাম,“জাস্ট দুই মাস দোস্ত। তারপর আবার তোকে দিয়ে দেব।”
মাথার ওপর থেকে সাল গাছের ছায়াটা সরে গেছে, বেশ কিছুক্ষন হল। সূর্যের উত্তাপ বাড়ছে। কালো পিচের রাস্তা ধীরে ধীরে গরম হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছি বেশিক্ষন আর দাড়িয়ে থাকা যাবে না। পায়ে চটি নেই; পেটের ভেতর থেকেও জানান দিচ্ছে, সকালে কিছু খাইনি। এখন কত বাজে জানতে পারলে ভাল হত; আমার হাতে ঘড়ি নেই। অপরিচিত কারও কাছে সময় জানতেও কেমন যেন লাগছে। তারপরও একজনকে প্রশ্ন করেই ফেললাম,“ভাই কত বাজে?” লোকটি অদ্ভুত দৃস্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেল! লোকটির হাতে গোল্ডেন কালারের একটি দামি ঘড়ি শোভা পাচ্ছে, অথচ কত বাজে তার উত্তর দিলেন না !! আশ্চর্য্য. . ! আগের পুলিশটি আবার ব্যাক আসছে, সরকার দেখি জনগনের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ ভাবে। পুলিশটি আমার সামনে এসে দাড়াল,“কি ভাই আপনার লোক এখনও আসেনি . .!?” “জ্বি না। আচ্ছা কত বাজে বলুনতো?” “দুপুর একটা। আচ্ছা উনি কি জানেন, আপনি এখানে অপেক্ষা করছেন?” “বোধহয় জানেন না।” পুলিশ লোকটি আগের মতই ভ্র“ কুচকে তাকালো, যেন আমার ভেতর পর্যন্ত দেখার চেষ্টা করছে। “আরও কিছুক্ষন অপেক্ষা করবেন নাকি?” আমি হাতের গোলাপটির দিকে তাকালাম, নিজের মাঝ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে গেল; বললাম, “দেখি।” পুলিশটি মুচকি হেসে চলে গেল।
ঘটনাটা গত বছরের। ফেব্র“য়ারীর ১৮ তারিখ বোধহয়, সেদিন খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল! আমি সাধারণত খুব সকালে ঘুম থেকে জাগিনা, নয়টা দশটার দিকে ঘুম থেকে উঠে ডিপার্টমেন্টে দৌড় দিই। কিন্তু ঐদিন মুখ হাত ধুয়ে হাটতে বের হলাম। শহীদুল্লাহ্ হলের গেট দিয়ে বের হয়ে জগন্নাথ হলের দিকে হাটা ধরলাম। তখনও ল্যম্পপোস্টের সোডিয়াম বাল্পগুলো জ্বলছে। কিছু বয়স্ক লোক মর্নিং ওয়াক করছে। মেডিকেলের সামনে একটা এম্বুলেন্সকে ঘিরে ছোট একটা জটলা, সম্ভবত কোন রোগী মারা গেছে। আমি খুব ধিরে ধিরে হাঁটছিলাম, এমন সময় লোকটিকে দেখলাম। কাঁচা পাকা চুল, হাসি হাসি মুখ। লোকটির মাঝ থেকে যেন আলো বের হয়ে আসছে। উনি যে রকম দৃঢ় ভঙ্গিতে হেটে আসছেন, তাতে যেকোন যুবকের হিংসে হবার কথা। আমার কি হল জানি না। উনি যখন আমাকে ক্রশ করছিলেন, হঠাৎ বলে বসলাম, “সুপ্রভাত!” আশ্চর্য আমার মাঝে এধরনের সামাজিকতা নেই বললেই চলে। পরিচিত কারও সাথে দেখা হলে কখনও সালাম দিই, কখনও দিই না; বড়জোর গুড মর্নিং। কিন্তু সুপ্রভাত! এই প্রথম। লোকটি ঠিক আমার সামনে দাড়ালো; কোন অপরাধ বোধ হল জানি না, আমি তাঁর চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না। কিন্তু ভরাট কন্ঠে উনি জানতে চাইলেন,“ভাল আছ?” আমি তাঁর চোখের দিকে তাকালাম, মনে হল উনি আমার ভেতর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছেন; বললাম, “জ্বি। . . . আপনি?” আমি তাঁর মুখের হাসি দেখে আবিষ্কার করলাম; কথা না বলেও শুধু মুখের হাসি দিয়েও কত সুন্দরভাবে জানিয়ে দেয়া যায়, “হ্যাঁ ভালো আছি।” উনি এরপর দাড়ান নি, আগের মতই জগিং করতে করতে এগিয়ে গেলেন। প্রথম পরিচয়ের দৈর্ঘ্য ঐটুকুই।
এরপর একুশে ফেব্র“য়ারী, আজকের এই যায়গায় তাঁর সাথে দেখা। কলো প্যান্ট সাদা পাঞ্জাবী, হাতে একটা লাল গোলাপ, মুখে অমায়িক হাসি; চোখে প্রতিক্ষা। তাঁর দাড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা অস্বাভাবিক সুন্দর, ঠিক যেন কোন ছবির পোট্রেট! আমি এগিয়ে যেতেই বললেন, “ভাল আছ?” “জ্বি। আপনি কি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন?” আমার প্রশ্ন শুনে উনি অনিশ্চিত ভঙ্গিতে হাসলেন। বললাম,“আমি কি আপনার সাথে অপেক্ষা করতে পারি?” উনি অবাক হলেন,“তুমি! কার জন্যে?” “আপনি যার জন্য অপেক্ষা করছেন, তার জন্য। আসলে আমি আপনার সাথে কিছুক্ষন থাকতে চাচ্ছিলাম।” উনি মুচকি হেসে বললেন,“অপেক্ষা কিন্তু অনেক ক্লান্তিকর।” “আপনাকে দেখে তা মনে হয় না।” “তাই! তা তোমার নাম কি?” “আমার নাম সৌরভ, বায়োকেমিস্ট্রিতে পড়ি।” “ভাল সাবজেক্ট . . .” এরপর অনেক কথা হল; সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষ, অথচ কত মজার মজার গল্প করছেন। কখন দুপুর হয়ে গেল বুঝতেই পারি নি। একসময় বললাম,“কই আপনার লোকতো আসছে না।” উনি হেসে বললেন,“আমিতো কোন মানুষের জন্য অপেক্ষা করছি না।” “তবে!!!?” উনি কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন, বললেন “একটা নতুন দিনের জন্য অপেক্ষা করছি; একটা নতুন দেশের জন্য অপেক্ষা করছি।” আমি আরও অবাক হয়ে গেলাম,“মানে!!!?” উনি বেশ কিছুক্ষন নিরব থেকে খুব ধিরে ধিরে শুরু করলেন,“আমার বাবা ১৯৫২ সালের ১৮ ফেব্র“য়ারী ঢাকায় আসেন, ভাষা আন্দোলনে যোগ দিতে। তারপর আর ফিরেন নি; তখন আমি বেশ ছোট। ১৯৭১ এ আমি আর আমার বড় ভাই যুদ্ধ করি, যুদ্ধে ভাই আমার সামনে মারা যায়। যুদ্ধের পরপরই আমরা দেশ ছেড়ে চলে যাই, ১৯৮০ সালে ফিরে আসি। এরপর থেকে প্রত্যেক বছর আমি ফেব্র“য়ারীতে ঢাকা আসি, আর ২১-শে ফেব্র“য়ারী এই যায়গায় এসে দাড়িয়ে থাকি।” “এই যায়গায়! কেন?” সবাই ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহীদমিনারে ফুল দেয় এবং এখান দিয়ে ফিরে যায়। এখানে দাড়িয়ে আমি সবার কথা শুনি, আমার ভাল লাগে। বাবার চেহারা মনে নেই। স্বাভাবিক ভাবেও হয়ত তিনি বেঁচে থাকতেন না, তারপরও তাঁকে খুজার চেস্টা করি।” আমি লোকটির কথা শুনে অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি, উনি বলতে থাকেন, “আর ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে এই গোলাপটি শহীদ মিনারে রেখে বাসায় ফিরে যাই। তুমি কি সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? . . .”
গত বছর আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করি নি; কিন্তু আজ করব। আমি জানি একটা মানুষ প্রায় দুই যুগ ধরে অপেক্ষা করেছেন, নতুন দিনের জন্য। তিনি বলেছিলেন অপেক্ষা ক্লান্তিকর, কিন্তু আমার ক্লান্তি আসছে না। আমি হাতের গোলাপটির দিকে তাকায়, তারপর সূর্য্যের দিকে। সূর্য্য অনেকটা ঢলে পড়েছে; ঘড়ি থাকলে ভাল হত, সময়টা দেখা যেত। আমি আবার সূর্য্যরে দিকে তাকায়। জানি না এই অপেক্ষা কখন শেষ হবে।
মঙ্গলবার, ২৩ মার্চ, ২০১০
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন